লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬ সকাল ১১:১৩:১৮
মস্তিষ্ককে সচল রাখতে প্রতিদিন সকালে যে ৫ কাজ করবেন
সকালের ব্যস্ততা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবধারিত অংশ। কাজ বা পড়ালেখার তাড়াহুড়ো, পরিবার সামলানো কিংবা দিনের অন্যান্য প্রাথমিক ব্যস্ততার চাপে একটি শান্ত ও নিজস্ব রুটিন তৈরি করা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ে।
অথচ ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘নেসপ্রেসো’ এবং ‘প্রজেক্ট হেলদি মাইন্ডস’-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মনে করেন সকালের এই প্রারম্ভিক মুহূর্তগুলো সারাদিনের মানসিক সুস্থতা ও মেজাজের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, দিনের প্রথম কয়েক ঘণ্টা কেবল মেজাজই ভালো রাখে না, বরং এটি আমাদের মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য রক্ষা এবং বার্ধক্যেও মেধা ও স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ রাখার মূল চাবিকাঠি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতের ঘুমের সময় মস্তিষ্কে এক অপূর্ব পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলে। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের প্রখ্যাত স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ড. ইভা এল. ফেল্ডম্যান ব্যাখ্যা করেন যে, রাতের ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কোষগুলো বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করে ফেলে।
‘ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক’-এর তথ্য অনুযায়ী, মস্তিষ্কের এই বিশেষ পরিচ্ছন্নতা নেটওয়ার্ককে ‘গ্লিমফেটিক সিস্টেম’ বলা হয়, যা তরলের সাহায্যে কোষের ক্ষতিকর বর্জ্য ধুয়ে মুছে দূর করে দেয়। ফলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি সতেজ ও প্রখর থাকে।
ব্রেইন ইনস্টিটিউটের স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. মাজিদ ফতুহি জানান, ঘুম থেকে ওঠার পরের প্রথম এক ঘণ্টা সারাদিনের ইতিবাচক আবহ তৈরি করে। তাই দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ককে সচল, কর্মক্ষম ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল রাখতে প্রতিদিন সকালে চিকিৎসকদের নির্দেশিত ৫টি সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
১. ইতিবাচক মানসিকতা দিয়ে দিন শুরু করা
সকালে ঘুম থেকে উঠেই মানসিক চাপ নেওয়া মস্তিষ্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ড. মাজিদ ফতুহি জানান, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের ফলে নিঃসৃত স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কর্টিসলের উচ্চ মাত্রা মস্তিষ্কের শেখা ও স্মৃতিশক্তির প্রধান কেন্দ্র ‘হিপোক্যাম্পাস’-এর কোষগুলোর ক্ষতিসাধন করে। তাই সকালে শান্ত ও আশাবাদী মনোভাব বজায় রাখা জরুরি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)-এর পরামর্শ অনুযায়ী, সকালের মানসিক চাপ কমাতে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কিছু সময় বিরতি নেওয়া, বাইরে খোলামেলা জায়গায় সময় কাটানো, ধ্যান করা এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলা অত্যন্ত কার্যকর।
২. বিছানা থেকে তাড়াহুড়ো করে না ওঠা এবং দিনের লক্ষ্য স্থির করা
সকালে অ্যালার্ম বাজতেই হুড়মুড় করে বিছানা ছেড়ে ওঠার বদলে কয়েক মিনিট নীরব থেকে নিজেকে প্রশ্ন করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। ড. ফতুহি বলেন, নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, ‘আজকের দিনটি আমি কীভাবে উপভোগ্য করব?’।
এই সময়ে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ৫টি মূল স্তম্ভ ব্যায়াম, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্দীপনা—কীভাবে সারাদিনের সূচিতে যুক্ত করবেন তা ভেবে নিন। এতে সারাদিনের কাজ গোছানো সহজ হয় এবং মেজাজফুরফুরে থাকে।
৩. মস্তিষ্ককে সক্রিয় ও কর্মক্ষম রাখা
সকালের প্রথম ভাগে মানসিক চর্চা মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোকে দারুণভাবে উদ্দীপিত করে। ড. ফেল্ডম্যানের মতে, সকালে বই পড়া, ডায়রি বা চিন্তাভাবনা লেখা এবং সুডোকু বা ক্রসওয়ার্ডের মতো ধাঁধা মেলালে দিনের শুরুতেই মস্তিষ্কের প্রখরতা বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া ড. ফতুহি প্রতিদিন সকালে ৩টি বিশেষ সংকল্প খাতায় লিখে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন:
নির্দিষ্ট লক্ষ্য: নিজের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের কথা স্মরণ করা।
উন্নয়নমুখী মানসিকতা: নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখা।
ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি: বাধা কাটিয়ে ভালো কিছু অর্জনের আশা রাখা।
৪. সকালে শারীরিক ব্যায়াম করা
সকালের শারীরিক ব্যায়াম স্নায়ুকোষের কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ড. ফেল্ডম্যান জানান, সকালে হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা কিংবা ইয়োগা করা মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। দলগত খেলাধুলা বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে করা ব্যায়ামও মস্তিষ্কের বয়স ধরে রাখতে সাহায্য করে।
২০২৪ সালে ‘জেরোসায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১২ সপ্তাহের স্ট্রেন্থ বা রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে গঠনমূলক পরিবর্তন আনে, যা নিউরোপ্লাস্টিসিটি বা মস্তিষ্কের নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৫. মস্তিষ্কবান্ধব ও পুষ্টিকর প্রাতরাশ গ্রহণ করা
সকালের নাস্তায় প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার এবং সঙ্গে চা বা কফি খাওয়া দিন শুরুর সেরা উপায়। বিশেষ করে ‘মাইন্ড ডায়েট’-এর অন্তর্ভুক্ত খাবারগুলো মস্তিষ্কের ক্ষয় রোধ করতে বিশেষভাবে প্রমাণিত। সকালের প্রাতরাশে সবুজ শাকসবজি, বাদাম, জলপাইয়ের তেল (অলিভ অয়েল), বেরি জাতীয় ফল, মুরগির মাংস ও মাছ যুক্ত করা মস্তিষ্কের পুষ্টি জুগিয়ে স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
বয়স বাড়লেও ব্রেইন থাকবে তরুণ
ড. ফেল্ডম্যান জোর দিয়ে বলেন যে, মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়া শুরু করতে কখনো দেরি করা উচিত নয়। ধূমপান, মদ্যপান বা অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে মস্তিষ্কের যে ক্ষতি হয়, তার লক্ষণ প্রকাশের পর তা সংশোধন করা কঠিন হয়ে পড়ে। মানব মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় গুণ হলো এর নিউরোপ্লাস্টিসিটি—অর্থাৎ এটিকে যেকোনো বয়সে পুনর্গঠিত ও শক্তিশালী করা সম্ভব। প্রতিদিন সকালের এই ছোট ছোট ৫টি অভ্যাসই নির্ধারণ করে দেবে ভবিষ্যতের দিনগুলোতে আপনার স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিমত্তা কতটা প্রখর থাকবে।
তথ্যসূত্র: দ্য হেলদি