নিজস্ব প্রতিবেদক, পাবনা
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬ রাত ০৭:০৪:১০
মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশক ব্যবহারে আঙ্গুল হারাতে বসেছেন কৃষক আশরাফ
মেয়াদ উত্তীর্ণ কীটনাশক জমিতে প্রয়োগ করার সময় বিষক্রিয়ায় ডান হাতের একটি আঙ্গুলে পচন ধরেছে আশরাফ আলী (৪৫) নামের একজন কৃষকের। চিকিৎসক তার একটি আঙুল কেটে ফেলার আশঙ্কা করেছেন। কিন্তু অর্থাভাবে তিনি চিকিৎসা শেষ না করেই বাড়ি ফিরেছেন।
এখানেই শেষ নয়। এ ঘটনায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফ আলীকে থানায় নিয়মিত মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বাধা আর চাপে মামলা করতে পারছেন না ওই কৃষক পরিবারটি।
ভুক্তভোগী কৃষক আশরাফ আলীর বাড়ি পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার দিলপাশার ইউনিয়নের বেতুয়ান গ্রামে। নিরক্ষর ও দরিদ্র আশরাফ ১২ দিন আগে ভাঙ্গুড়া পৌর শহরের শরৎনগর বাজারের আব্দুল জব্বারের কীটনাশকের দোকান থেকে ৩৩ মাস আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া কীটনাশক কিনেছিলেন।
ভুক্তভোগী কৃষক পরিবার সূত্রে জানা যায়, কৃষক আশরাফ এ বছর বেতুয়ান গ্রামে জমিতে স্বর্ণা ধানের আবাদ করেছেন। জমিতে মাজরা পোকা দমনের জন্য গত ১৫ অক্টোবর স্থানীয় আব্দুল জব্বারের কীটনাশকের দোকান থেকে কার্টাপ্রিড নামের একটি দানাদার কীটনাশক কেনেন। পরেরদিন জমিতে প্রয়োগ করার জন্য কীটনাশক প্যাকেট খুলে পানিতে মিশ্রণ করার সময় হাতে আঠালো হয়ে আটকে যায়। তাৎক্ষণিক বাড়িতে এসে সাবান দিয়ে কয়েকবার হাত ধুয়ে কীটনাশক উঠানোর চেষ্টা করেন আশরাফ।
এরপরেও হাতে চুলকানি ও জ্বালাপোড়া সহ ফুলে যেতে থাকে। এ অবস্থায় পরদিন ১৬ অক্টোবর আশরাফ তার স্ত্রীকে নিয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে অবস্থা সংকটাপন্ন মনে করে চিকিৎসক আশরাফকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে প্রায় ৯ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর অর্থ সংকটে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। এরপর গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) অসুস্থ আশরাফ বাড়ি ফিরলে গ্রামবাসীর পরামর্শে কীটনাশকের ডিলার আব্দুল জব্বারের দোকানে আসেন এবং তার কাছে অভিযোগ জানান।
এ সময় আব্দুল জব্বার ভুক্তভোগী আশরাফের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে বিষয়টি গোপন রাখতে বলেন। কিন্তু আশরাফের পরিবার বিষয়টি না মেনে জব্বারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাহান অভিযোগ পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হন। কিন্তু এর আগেই ডিলার আব্দুল জব্বার কৌশলে পালিয়ে যান। সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফ আলীকে থানায় গিয়ে নিয়মিত মামলা করার পরামর্শ দেন এবং ওসিকে মামলা নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ার নির্দেশ দেন।
আশরাফ আলীর স্ত্রী জনিফা খাতুন বলেন, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে কীটনাশকের মেয়াদ শেষ হয়। আমার স্বামী নিরক্ষর বলে সেটা বুঝতে পারেনি। এটা ব্যবহার করে হাতের একটা আঙুল পচে গেছে। ডাক্তার বলেছে আঙুল কেটে ফেলতে হবে। কিন্তু আমার অনুরোধে তিনি আরেকটু সময় চিকিৎসা দিয়ে পড়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান।
তিনি আরো বলেন, এসি ল্যান্ডের নির্দেশে মামলা করতে গেলে এলাকার কিছু নেতা মামলা করতে দেয়নি এবং হুমকি ধামকি দিয়েছে। আমরা দরিদ্র মানুষ তাই ভয়ে মামলা করতে যাইনি।
আশরাফ আলী বলেন, মামলা করতে যাওয়ার পথে বাধা দিছে। শামসুল নেতা বলছে সমাধান করে দিবে। মামলা করে কি হবে, কিছুই পাবে না। এসব বলছে। এখন দেখি কি করে।
আশরাফ ও তার স্ত্রী জানান, তাঁরা যখন থানায় যাওয়ার চেষ্টা করেন, তখন স্থানীয় বিএনপি নেতা রাসেল রানা দুলু সহ কয়েকজন নেতাকর্মী তাঁদের শরৎনগর গরু হাটের পাশে একটি কক্ষে আটকে রাখেন এবং ভয়ভীতি দেখান। পরবর্তীতে স্থানীয় সার ডিলার ঢাকা স্টীলের স্বত্বাধিকারী বিএনপি নেতা শামসুল আলম তাঁদের নিয়ে বসে সালিশের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে যাওয়া এক সাংবাদিককেও হুমকি দিয়েছেন ঐ নেতারা। ঐ সাংবাদিক ভুক্তভোগীর মুঠোফোনে কল করলে দুলু ফোনটি রিসিভ করেন এবং কৃষকের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে অনুরোধ করলে তিনি উত্তেজিত হয়ে কথা বলেন এবং যা বলার তাকেই বলতে বলেন।
শামসুল ইসলাম ভাঙ্গুড়া সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আর রাসেল রানা দুলু জিয়া সাইবার ফোর্স ভাঙ্গুড়া সদর ইউনিয়ন শাখার বহিষ্কৃত সভাপতি।
এ ঘটনায় বিএনপি নেতা শামসুল আলম বলেন, তাদের থানায় যেতে বাধা দেয়া হয়নি। তারা দরিদ্র মানুষ আমরা চেয়েছি তারা যেনো সঠিক চিকিৎসাটা পায়। তাই তাদের সাথে কথা বলেছি সেই সাথে তাকে চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার টাকাও দেয়া হয়েছে। তারা যদি চায় অবশ্যই আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।
অভিযুক্ত কীটনাশক ডিলার ও বিক্রেতা আব্দুল জব্বার বলেন, আশরাফ আমার দোকানে সার-কীটনাশক নেন এটা সঠিক। কোনো কারণে আমার অজ্ঞাতসারে মেয়াদ উত্তীর্ণ কীটনাশকটা তার কাছে গেছে, কিভাবে গেছে এটা আমার জানার বাইরে। তারপরও যেহেতু একটা সমস্যা হয়ে গেছে, সেকারণে আমি তাকে বলেছি চিকিৎসা নেওয়ার জন্য। এ জন্য আমার পক্ষ থেকে একজন তাকে দশ হাজার টাকা দিয়েছে। তবে, তাকে মামলা করতে বাধা বা কোনো নেতাকে বলা এসব তিনি করেননি বলে দাবি করেন জব্বার।
এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাহান বলেন, ঘটনাস্থলে এসে অভিযুক্ত কীটনাশক ডিলারকে পাওয়া যায়নি। তাই ভুক্তভোগীকে নিয়মিত মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিউল আযম বলেন, সহকারি কমিশনার (ভূমি) স্যার বলেছিলেন কীটনাশক ডিলারের বিষয়ে মামলা নিতে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা এ বিষয়ে আর থানায় আসেনি। এরপরেও খোঁজখবর নেয়া হবে।